বিজ্ঞাপন দিন

ফিলিস্তিনের মানচিত্র মুছে ফেলা যাবে না | মুয়ায আল মাহমুদ

 


পাখির আছে নীড়, পিঁপড়েরও আছে গর্ত। ফিলিস্তিনি মানুষের কোনো ঘর নেই। ফিলিস্তিন-ইসরাইলের সংঘাত চলছে প্রায় পঁচাত্তর বছর ধরে। সেই একপেশে সংঘাতে গাজা আবারো রক্তাক্ত বিরান প্রান্তের জ্বলন্ত এক শ্মশান। মানুষ ঘর হারা। সন্তানদের মৃতদেহ পিতাদের কাঁধে, চোখে অশ্রু; বাসভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মারা যাচ্ছে আপনজনেরা, স্বজনদের আহাজারি পৃথিবীর ইতিহাসে মানবতা বিসর্জনের এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য! মুহুর্মুহুবোমা বর্ষনে পুরো শহর নরকে পরিণত হয়েছে। 


জায়োনবাদী ইসরায়েলি সৈন্যদের হামলা অতীতের যে কোনো ভয়াবহতাকে ছাড়িয়ে গেছে। ফিলিস্তিনিদের তাদের বাসভূমি থেকে উৎখাত করে ইসরায়েলিদের বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখন ফিলিস্তিনিরাই নিজ দেশে পরবাসী। তাদের চলতে দেওয়া হয় না, সমুদ্রবন্দর দেওয়া হয় না। এ ইতিহাস দীর্ঘ এবং আমাদের বিশ্বসভ্যতার অন্যায্যতার চরম উদাহরণ। দশকের পর দশক এ অন্যায্যতা ও ইসরায়েলি দখলদারির বিরুদ্ধে জমানো প্রতিশোধের কিছুটা বহিঃপ্রকাশ হামাসের ‘৭ অক্টোবরের’ চকিত রকেট হামলা। এই অপ্রত্যাশিত হামলার পর ইসরায়েল অত্যন্ত কঠোর হয়ে উঠেছে। দিন-রাত জুড়ে হামলায় তারা গাজা শহরকে মাটির সঙ্গে প্রায় মিশিয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তি রণতরী পাঠানো সহ ইসরায়েলকে নানাভাবে সাহায্য করছে। ব্রিটেন ইসরায়েলের এ অমানবিক হামলাকে ‘আত্মরক্ষা যুদ্ধ’ ট্যাগ দিয়ে জায়োনিস্টদের বিজয় কামনা করেছে। ফ্রান্স বলছে, আমরা ইসরায়েলের নৈতিক সমর্থনকারী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, ‘আমাদের হৃদয় দুমড়ে-মুচড়ে যেতে পারে, কিন্তু আমাদের সংকল্প পরিস্কার, আমরা ইসরায়েলের পাশে আছি। হামাস একটি সন্ত্রাসী দল; তাদের কোনো ছাড় দেয়া হবে না’।


ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামাস কি অনেক বড় শক্তি? গাজা সীমান্তে লক্ষাধিক সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। তিন লাখ রিজার্ভ সৈন্যের ডাক পড়েছে। বিভিন্ন দেশে থাকা ইসরায়েলি সৈন্যদের বিশেষ ফ্লাইটে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। এত আয়োজন-তৎপরতা কী ইঙ্গিত করে? মাত্র কয়েক হাজার হামাস যোদ্ধার বিরুদ্ধে লড়তে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহর পাঠানো হলো কেন? মূলত এ সবই বিশ্ব মোড়লদের মোড়লিপনার আসল চিত্র ও চরিত্র। জায়োনবাদী ইহুদীদের তারাই লালন-পালন করে জন্ম দিয়েছে অবৈধ ইসরায়েল রাষ্ট্র। কথিত মানবাধিকারের হর্তাকর্তারাই ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনে ‘জাতিগত নিধন’ ও গণহত্যার সবুজ সংকেত দিয়ে আসছে সব সময়।


অস্বীকার করার জো নেই, হামাসের এ হামলার সাথে ইসরায়েলের প্রতিদিনের আচরণ ও ঐতিহাসিক কিছু যুক্ত। ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের মূল কারণ ঔপনিবেশিকতা। ফিলিস্তিনিরা যুগ যুগ ধরেই এই উপনিবেশবাদী ইসরাইলের ভূমি দখল এবং নির্যাতন বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আসছে। এই সংগ্রাম করতে গিয়ে তারা তাদের স্বজনদের হারিয়েছে, হারাচ্ছে। লাশ, পঙ্গুত্ব, গোলাবারুদ, বন্দিত্ব নিয়ে জীবন পার করছে। ইসরায়েলকেও বুঝতে হবে, স্বজন হারানোর ও বঞ্চনার যন্ত্রনা কী, তার পরিণতি কী হতে পারে।


হামাসের প্রতিরোধ-হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রত্যেক হামাস সদস্যের মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেছে। গাজায় সর্বাত্মক হামলা করেছে। তারা হামাস নিমূর্লের নাম করে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের ওপর নির্বিচারে বোমা হামলা করছে। সেখানে প্রতি এক মিনিটে একজন হাসপাতালে যাচ্ছে, প্রতি পনের মিনিটে একজন শিশু মারা যাচ্ছে। আহত ও নিহতদের মধ্যে শতকরা পঁচাত্তর ভাগ নারী ও শিশু! মানবাধিকার ও বিশ্ব শান্তির জয় গান গাইতে গাইতে মুখে ফেনা তোলা পশ্চিমারা ইসরাইলের এই বর্বরোচিত হামলার ন্যায্যতা ও বৈধতা কিভাবে দিচ্ছে?


বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ ছোট শহর গাজায় বাস করে তেইশ লাখ মানুষ। গাজা সীমান্তের তিন’শ মিটারের মধ্যে এই বাসিন্দারা চলাফেরা করতে পারে না। তাদের জন্য বরাদ্দ জলসীমার মাত্র পঞ্চাশ ভাগ তারা ব্যবহার করতে পারে। ষাট শতাংশের বেশি খাদ্য সংকট সব সময়। এই বহুবিধ সংকট ও মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে থাকা গাজাবাসীকে ঘিরে আছে ইসরাইলের বর্বর ও অমানবিক সেনারা। এক দশক আগে গাজার এমন পরিস্থিতির কথা স্বীকার করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন মন্তব্য করেছিলেন, ‘গাজা হচ্ছে একটি ছাদখোলা বৃহত্তম কারাগার’। বিশ্বব্যবস্থার জমিদারেরা কি চাইলে এত বছরেও ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতি বিধান করতে পারত না?


তারা তা করবে না। কারণ গণতন্ত্র, মানবাধিকার, স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার এ সবই আপেক্ষিক। যার ক্ষমতা আছে মানবাধিকার শুধু তার জন্য। সংজ্ঞা তাদের পক্ষে নির্ধারিত হয়। তাই, নিজেদের শেষটুকু রক্ষা করার জন্য হামাস ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে নামলে তা হয়ে যায় ‘সন্ত্রাসী হামলা’! সেই সন্ত্রাস দমনে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। বন্ধ করা হয় খাবার সরবরাহ। বোমা ফেলা হয় অবিরাম। ফিলিস্তিনিরা কি মানুষের সন্তান নয়? তাদের মানবাধিকার নেই? তাদের জন্য জেনেভা কনভেনশন নেই?দুঃসময় তো অনেক গড়িয়েছে। পৃথিবী নামক মা ফিলিস্তিনিদের আশ্রয় দেয়নি। তাদের সাহায্যে কেউ এগিয়ে আসেনি। তাদেরকে কেউই বঞ্চনা থেকে মুক্তি দেয়নি। কথিত মানবাধিকারের হর্তাকর্তা গণতন্ত্র কিংবা শ্রেণী বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার মিছে নায়ক সমাজতন্ত্র কোনো কিছুই ফিলিস্তিনিদের স্বাধিকার ফিরিয়ে দিতে পারেনি। দু-একটা ‘সস্তা’ বিবৃতি আর নামকাওয়াস্তে কিছু ত্রাণ ছাড়া বিশ্বের কাছ থেকে ফিলিস্তিন আর কিছু পায়নি। 


ফিলিস্তিনিরা যেটুকু টিকে আছে; প্রতিরোধের কারণেই, না হলে ইসরায়েল ব্ল্যাকহোলে তারা এতদিনে বিলীন হয়ে যেত। ফিলিস্তিনিরা বুঝে গেছে পৃথিবী তাদের ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছে। তাই নিজেদের সবটুকু নিয়ে প্রতিরোধ-হামলা করে জানান দিয়েছে, আমাদের মানচিত্র কখনো মুছে ফেলা যাবে না, আমরা আমাদের ভূমি বুঝে নেবই। ঠিক যেন ফিলিস্তিনি জাতীয় কবি মাহমুদ দারবিশের মর্মস্পর্শী সেই কবিতা পঙক্তির প্রতিধ্বনি—

“আমাদের শরীর দিয়ে রুদ্ধ করার জন্য আমরা কেটে নেব গানের হাত।

এখানে মরবো আমরা, এই শেষ গলিতে।

এখানে, এখানেই আমাদের লহু রুয়ে দেবে তার জলপাইগাছ’।

এবং আমরা বিশ্বাস করি, দখলদারদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনের এই 

ন্যায়যুদ্ধে সত্যের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।”

মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

নবীনতর পূর্বতন