রাতে একা-একা ছাদে বসে ছিলাম, সাথে কেউ ছিল না। সেদিন বোধহয় কোন বিশিষ্ট রজনি ছিল। চেয়ারে হেলান দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। চাঁদের আলোতে পুরো আকাশ ছায়া-শুভ্র রঙের মত মনে হচ্ছিল। চাঁদের পাশের মেঘখণ্ডগুলো বেশ আলোকিত ছিল। যখন মেঘ এসে চাঁদকে ঢেকে দিত, মনে হত পুরোটা পৃথিবী অন্ধকারে ঢেকে গেছে। মেঘ সরে গেলে আলোকোজ্জ্বলহীন পৃথিবী পুনরায় চাঁদের আলোতে ছেয়ে যেত।
চাঁদের একটি আকৃতি-প্রকৃতি আছে। এর আকৃতির সাথে কোনো কিছুর একটুও সদৃশ খুঁজে পাইনি আমি। পুরোপুরি গোলাকার। বৃত্তাকারটা কত নিখুঁত! গোলাকার অনেক বস্তুই আছে। কিন্তু আমার কাছে এর কোন উপমা নেই। তুলনাহীন অপার এক সৃষ্টি এ চন্দ্র। যদি উপমা হত, তাহলে এর মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব খুঁজে পাওয়া যেত কিনা কে জানে! কেননা সারাৎসার তখনই শ্রেষ্ঠ অংশ হতে পেরেছে। যখন তার ও অন্যান্য অংশের মাঝে কোনো পার্থক্য খুঁজে পাওয়া না গেছে।
পূর্ণিমার সেই রাতে আল্লাহ তাআ’লা এক আত্মিক প্রশান্তি দান করেছিলেন। কতক মেঘ আসছিল যাচ্ছিল। চাঁদের গায়ের পাংশুটে দাগগুলো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না।
শৈশবে চাঁদের গায়ের ধোঁয়াশা দাগগুলোর মাঝে চাঁদের বুড়ীকে খুঁজতাম। একজন আরেকজনকে জিজ্ঞেস করতাম, ‘চাঁদের বুড়ীটা কোথায় বসে আছে রে’! সে উত্তর দিত; সে দেখছে, বুড়ী বসে বসে কাঁথা সেলাচ্ছে। আমি খুঁজতাম,পুরো চাঁদের মাঝে কোথাও খুঁজে পেতাম না। মনে হত বুড়ী শুধু ওদের সাথেই দেখা দেয়, আমার মত চায় না। তাই আমি তাকে দেখতে পাই না। কেমন হাস্যকর...!
আমার শৈশবের প্রায় দশটা বছর আটচালা এক চারকোণা বাড়িতে অতিবাহিত হয়েছে। বাড়ির ঠিক মধ্যখানে একটা কাঁঠালগাছ ছিল। গাছটা ছিল ফলবর্জিত। যেগুলো হত, এক আঙ্গুলের চেয়ে আর দীর্ঘ হত না। সে গাছটারই নিচে বাড়ির সকলে একত্রে বসে নানান গল্পগুজব করতাম। তখন পুরো উঠানটাই হত বাড়ির সকলের জন্য আলাপ-বিলাপের স্থান। পূর্ণিমার রাতে সারা উঠান ছায়া-শুভ্র বর্ণ ধারণ করত। কাঁঠালপাতার ছায়া পড়ত উঠানে। সকলের চেহারা চাঁদের আলোতে ‘চন্দ্রবর্ণ’ হয়ে যেত।
শৈশবের ছোট বড় সকল ঘটনাই কৈশরকে আন্দোলিত করে। এ ব্যাপারটাও যখন আমার মনে হয়, আমি খুব আপ্লুত হই। আমার চোখে সেই চন্দ্রমুখগুলো স্থায়ী হয়ে গেছে। চাঁদের জোসনা আমাকে এক অলীক শক্তি প্রদান করে।
সেদিন দীর্ঘক্ষণ চাঁদের আলোয় একলা ছাদের ওপর আমি এক আত্মিক শক্তি অনুভব করেছিলাম।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন