কুরবানী ঈদের বিরতির পর। মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে প্রদত্ত মুসলমানদের মহা আনন্দোৎসব পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে দেশজুড়ে যে আনন্দস্রোত বয়ে গেছে। তার রেশ এখনো কাটেনি। আনন্দঘন মুহূর্তগুলো অতিবাহিত করে প্রফুল্লচিত্তে সবাই শহুরে জীবনে ফিরতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে ব্যস্ত শহরে বাড়ছে কোলাহল।
শহরের আনাচে-কানাচে অবস্থিত মাদ্রাসাগুলোর খোলার দিনও ঘনিয়ে আসছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা খ্যাতিমান মাকবুল এদারা ‘মাদানীনগর মাদ্রাসা’। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইলমে-নববী পিপাসু তালিবুল ইলমরা ছুটি কাটিয়ে দলে দলে আবার ফিরে আসছে সুরভিত পুষ্পকাননে।
মাদ্রাসার প্রধান ফটক পেরিয়ে মাঠে বকুলগাছটার নিচে এসে দাঁড়িয়েছে যায়েদ। লম্বা সফরের পর ক্লান্ত-অবসন্ন শরীরে প্রাণপ্রিয় মাদ্রাসায় প্রবেশ করে ভিন্নরকম এক ভালো লাগা কাজ করছে তার মধ্যে। সুদীর্ঘ দু’টি সপ্তাহ পর পড়ন্ত বিকেলের মোহনীয় পরিবেশে প্রাণাধীশ মাদ্রাসাকে আজ যেন একটু বেশিই সুন্দর লাগছে। সৌন্দর্য্যের সবটাই রবের একনিষ্ঠ প্রেমিক, দুনিয়াবিমুখ ওলীর নিশিরাতে নিরবে-নিভৃতিতে জায়নামাজে ঝড়ানো অশ্রুনদের ফসল।
যায়েদ আজ খুব খুশি। খুব উৎফুল্ল মনে হচ্ছে নিজেকে। সময়মতো নিরাপদে মাদ্রাসায় পৌঁছতে পেরে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনে তার মাথা একরকম নুয়ে পড়ছে জালালী দরবারে, মুখে যেন লেগেই আছে শুকরিয়া বাণী ‘আলহামদুলিল্লাহ’।
মাগরিবের নামাজের সময় হয়ে এসেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়ত মুয়াজ্জিনের সুরেলিত কন্ঠে ভেসে আসবে আজানের ধ্বনি। নামাজের জন্য মাঠ থেকে মসজিদের দিকে এগুতেই দরজায় তার চোখ আটকে গেল। আরে, এ যে আনাস!
মাদানীনগর মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার এক বিরাট স্বপ্ন লালন করে এ ছেলেটি। বুকভরা আশা নিয়ে এসেছিল ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তার পৌঁছতে পৌঁছতে মাদ্রাসার ভর্তি কৌটা পূরণ হয়ে যায়। অনেক চেষ্টা করেও সে কিছু করতে পারেনি। তখন তার সাথে যায়েদের আকস্মিক পরিচয় হয়। যায়েদের সান্তনাবাণীতে সেদিন শান্ত হয় আনাস। পরবর্তী বছর আবার ভর্তি হওয়ার আশা নিয়ে অনত্র ভর্তি হয় সে।
আজ আনাসকে আবার মাদানীনগরে দেখে তার দিকে এগিয়ে যায় যায়েদ। সালাম দিয়ে সহাস্য বদনে আনাসকে বলে, আরে আনাস ভাই না! কেমন আছ? তোমাকে এখানে দেখে খুব খুশি হলাম।
হঠাৎ অপরিচিত লোকদের মাঝে নিজের নাম শুনে একরকম ভড়কে যায় আনাস। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা হাসোজ্বল ছেলেটাকে চেনা চেনা মনে হলেও এখন তার সম্পর্কে কিছু মনে পড়ছে না। আনাস তাকে চিনছে না দেখে যায়েদ বলল, আরেকটু আগে পৌঁছতে পারলেই তোমাকে হারতাম না এ বছরের জন্য। খুবই ভালো হত তোমাকে আমাদের মাঝে পেলে। তোমার সাথে ভর্তির দিন পরিচয় হয়েছিল। আমি যায়েদ..
যায়েদকে আর এগুতে না দিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল আনাস। গন্ডদেশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল দু’ফোঁটা অশ্রু। বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে বলল, যায়েদ ভাই! তুমি এখনো আমার কথা মনে রেখেছো। আমার নামটা পর্যন্ত তোমার মনে আছে। সেদিন তোমাকে পাশে পেয়ে কী যে উপকৃত হয়েছিলাম, তা কখনো ভোলার নয়। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া আবেগ-গলিত এ অশ্রুকণা যে কতটা হতবাক আর বিস্মিত হওয়ার প্রতিফলন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যার পুরোটার হক্বদার যায়েদের ঐ ছোট কাজটা। আকস্মিকভাবে পরিচিত হওয়া আনাসের নাম মনে রাখা। কাউকে সম্মান প্রদর্শন করার অন্যতম একটি মাধ্যম এটি। হঠাৎ কারো সাথে পরিচয় হওয়ার পর দীর্ঘ ব্যবধানে আবার যদি তার সাথে দেখা হয়, আর তাকে স্বাগত জানাতে নাম ধরে সম্বোধন করা হয়, তাহলে এটি তার উপর যথেষ্ট প্রভাব ফেলবে। আর আচরণে অভিভূত হয়ে হৃদয়াঙ্গিনায় হিড়িক পড়ে যাবে হৃদতা আর বিনম্র শ্রদ্ধাবোধের। সে বুঝে নিতে বাধ্য হবে, অন্যের কাছে তার যথেষ্ট মূল্য আছে, মর্যাদা আছে।
মানব জাতির মাঝে পারস্পারিক অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে আবেগ। একরকম স্বভাবজাত বস্তু এটি মানুষের। সামান্য থেকে সামান্য বিষয়েও এটি ঝড় তুলতে পারে মনোজগতে। আর মনোতুষ্টির জন্য সামান্য সম্মাননাও তাদের বিস্ময়ে, আনন্দে, খুশিতে আত্মহারা করে তোলে। যেহেতু কারো নাম মনে রাখার মাধ্যমে তার আবেগ আন্দোলিত হয়ে উঠে, তাই এটি অবশ্যই ফলপ্রসু একটি উপায়। তবে এক্ষেত্রে শিষ্টাচারের প্রতি লক্ষ্য রাখা বাঞ্চনীয়।
হঠাৎ কারো সাথে পরিচিত হয়ে তার নাম মনে রাখা যথেষ্ট দুঃসাধ্য বিষয়। এর জন্য পযার্প্ত পরিমাণে চৌকান্না আর হুশিয়ার হওয়া চাই। আর এটি প্রয়োগ করতে কিছু কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে।
প্রথমত, নাম শোনার সময় গুরুত্ব দিয়ে শোনা। আর কিছুক্ষণের মধ্যে শোনাতে হবে ভেবে প্রস্তুত থাকা। পাশাপাশি তার চেহারা, বাচনভঙ্গি, হাসির ধরণ ইত্যাদিও ভালোভাবে আত্মস্থ করার চেষ্টা করা। যেন স্মৃতিপটে তা গেঁথে যায়।
সম্ভব হলে কথার ফাঁকে ফাঁধে বারবার তার নাম পুনরাবৃত্তি করা। এতে করে তার নাম মনে রাখা হবে বলে আশা রাখা যায়। সম্বোধন করার ক্ষেত্রে নাম ধরে সম্বোধন করা, শুধুমাত্র সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ না। আর সাধারণ একটি পর্যালোচনা এর উপকারীতা প্রকাশে যথেষ্ট না। যেখানে বিশ্বচরাচরের শ্রেষ্ঠ রচনা মহা ঐশীগ্রন্থ আল কুরআনে স্বয়ং আল্লাহ তাআ’লা এর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আর পবিত্র গ্রন্থে এর দৃষ্টান্ত স্থাপিত হওয়ার চেয়ে গ্রহণযোগ্য আর বড় কোনো প্রমাণ হতে পারে না। কোরআন শরীফের বিভিন্ন জায়গায় বারবার আল্লাহ তাআ’লা তার প্রাণপ্রিয়
নবী-রাসূলদের নাম ধরে সম্বোধন করে আয়াত নাযিল করেছেন। যার হিসেব দিতে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে অবশ্যই।
সুতরাং সুন্দর একটি কৌশল অবলম্বন করে, জনজীবনে আনন্দ আর খুশির একটি ঢেউ বইয়ে দেওয়া যেতে পারে।
তাই সবার কাছে একটি আবেদন, ভাই! নামটা বলে যান।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন