২০১৯ সাল, শুরু হল নিজের স্বাধীনতা। নিজের কাজ নিজে করা শিখে গেলাম। এখন দীর্ঘ ৬—৭ ঘন্টার পথ একাই অতিক্রম করতে পারি। মাদ্রাসা থেকে বাড়ি, ফের বাড়ি থেকে মাদ্রাসা। এভাবেই নিজের অজান্তে অতিবাহিত হয়ে গেল একটি বছর।
বার্ষিক পরীক্ষার কিছুদিন আগে এশার নামাজের পর পড়ায় ফাঁকি দিয়ে ছয়জনমিলে পরিকল্পনা করতে বসলাম। কোথায় ঘুরতে যাওয়া যায়? অনেক চিন্তা ভাবনার পর এ সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম যে, সমুদ্রকন্যা কুয়াকাটা দিয়ে শুরু হোক আমাদের প্রথম সফর। যেমন সিদ্ধান্ত তেমন কাজ। ছুটির দিন পর্যন্ত ছয়জন একসঙ্গে ছিলাম, হঠাৎ দু’জন লাপাত্তা। তাই আমরা চারজন নিজেদের সিদ্ধান্তে অবিচল রইলাম।
রাতে চারজন একত্র হয়ে ঢাকার সদরঘাটে এক মসজিদে এশার নামাজ আদায় করলাম। রাত ন’টায় আমাদের বহনকারী লঞ্চটি যাত্রা শুরু করল। বাবা আমাদের হাসিমুখে বিদায় জানালেন। শুরু হলো সফর, আমাদের মত হাজারখানেক যাত্রী নিয়ে লঞ্চটি ছুটে চলছিল বরিশাল এর উদ্দেশ্যে। সুবহে সাদেকের আবছা আলোয় লঞ্চটি তার চলার সমাপ্তি ঘোষণা করল। নেমে ফজরের নামাজ আদায় করলাম।
যেহেতু বরিশাল বিভাগে পা রেখেছি; বাংলাদেশের অন্যতম সৌন্দর্যমন্ডিত ‘গুঠিয়া মসজিদ’ এখানেই অবস্থিত, তাই প্রথমেই গেলাম গুঠিয়ায়। একদম গ্রাম অঞ্চলে গড়ে তোলা হয়েছে এ মসজিদটি। এ অঞ্চলেও এমন দৃষ্টিনন্দন মসজিদ গড়া সম্ভব! দূর থেকে দেখে যে কেউ মুগ্ধ হতে বাধ্য। বিশেষভাবে রাতের আলোকসজ্জা এর সৌন্দর্যকে আরো একধাপ বাড়িয়ে দেয়।
পরদিন বরিশাল জেলা শহরে ঘুরতে বের হলাম। সারাদিন ঘোরার পর বেলা দু’টার দিকে কুয়াকাটার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম, পৌঁছতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। দিনের গোধূলিলগ্নে ক্লান্ত সূর্য গা এলিয়ে এখনই অস্ত যাবে। সৈকতের আশপাশে প্রচন্ড ভীড়, এর মধ্যেই সূর্যাস্ত উপভোগ করলাম। বলে রাখি, কুয়াকাটাই বাংলাদেশের একমাত্র স্থান, যেখান থেকে সূর্যাস্ত এবং সূর্যোদয় উভয়টি খুব কাছ থেকে দেখা যায়। তবে সূর্যোদয়ের দৃশ্য তুলনামূলক বেশি মোহনীয়।
মাগরিবের নামাজ আদায় করে সমুদ্রতীরে গিয়ে পায়চারী করছিলাম আর ভাবছিলাম রাত্রিযাপন কোথায় করা যায়? যদিওঅনেক হোটেল রয়েছে, কিন্তু কোন দিকে যাব? বোকার মত প্রশ্ন হলেও প্রথমবার বলে কথা। অবশেষে আল্লাহর মেহেরবানীতে স্বল্প খরচে ইলিশ পার্কে হোটেলের ব্যবস্থা হয়ে গেল।
এশার নামাজ আদায় করে হোটেল থেকে রাতের খাবার খেয়ে দীর্ঘ সময় সমুদ্র পারে বসে ছিলাম। রাতে সমুদ্রকন্যা ভিন্ন রূপ ধারণ করে। চারিদিক নিরব; শুধু শোনা যাচ্ছে ঢেউয়ের মৃদুআওয়াজ। হোটেলে ফিরে ক্লান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে দিয়ে হারিয়ে গেলাম ঘুমের রাজ্যে। আল্লাহর অশেষ কৃপায় সেদিন তাহাজ্জুদের সৌভাগ্য হয়েছিল। সেদিনের তাহাজ্জুদে ভিন্ন একটা স্বাদ অনুভব করেছিলাম। কেমন ছিল সেই স্বাদ...!
ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার সাথে সাথে নামাজ আদায় করে দু’টা মটর সাইকেলে চড়ে আমরা রওনা হলাম প্রভাতরবি দেখার জন্য। কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তায় মটর সাইকেলের হেডলাইট জ্বালিয়ে চলতে লাগলাম। চারিদিক পিনপতন নিরবতা বিরাজমান। এরমধ্যে আবার হালকা শীতের আমেজ। অদূরেই কোনো মসজিদের মাইক থেকে ভেসে আসছিল অতিপরিচিত একটা গজলের সুর। সেই সুর আর পাখির চাপা গুঞ্জন নির্জনতাকে আরো শিহরিত করে তুলছিল।
সবেমাত্র আকাশে সাদা আবরণ ফুটে ওঠেছে। এই আবছা আলোতে কিছু লোক দেখতে পেলাম যারা রাস্তার পাশে বেচাকেনার জন্য ছোট ছোট দোকান খুলতে ব্যস্ত ছিল। কিছুক্ষণ পর সূর্য পূবাকাশে উঁকি দিলে অনেক পর্যটক ভীড় জমাবে। পর্যটকদের উদ্দেশ্যেই তাদের এই তাড়া।
পূবাকাশ লাল রক্তিম বর্ণ ধারণ করে সাগরের তলদেশ থেকে উদিত হলো প্রভাত রবি। এ দৃশ্য যেন আলাহ তাআ’লার কুদরতের এক অপূর্ব নিদর্শণ। সূর্য লাল বর্ণ ছেড়ে যখন নিজের তেজ বাড়াতে থাকে তখন সৈকতে জমে লাল কাঁকড়ার মেলা। পাশেই দন্ডায়মান বিশাল ঝাউবন। যদিও ভয় লাগছিল তবু ভিতর থেকে ঘুরে আসলাম। আগে কখনো এতো ঝাউগাছ একত্রে দেখিনি। যেখানে ঝাউবন এর সমাপ্তি ঘটেছে, সেখান থেকে ঐতিহ্যবাহী পায়রা সমুদ্রবন্দর দৃষ্টিগোচর হয়।
দেখতে দেখতে আমাদের দু’দিনের সফর শেষ হয়ে নিকটবর্তী হলো ফেরার পালা। দুপুরের খাবার সেরে সমুদ্রকন্যাকে বিদায় জানিয়ে আমরা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মন্তব্য লিখুন